সেদিনের গণঅভ্যুত্থানে কী ঘটেছিলো

<![CDATA[

১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি। সেদিন ছিল হরতাল। এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খান সরকারবিরোধী আন্দোলন রূপ নেয় তীব্র এক গণঅভ্যুত্থানে। যা বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তীতে আজকের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্রটির জন্ম হয়।

১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। এতে করে স্বাধিকার আন্দোলনের গতি তীব্র হয়। আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে ষড়যন্ত্রমূলক আগরতলা মামলা রুজু করে পাকিস্তানি শাসকরা। আর মামলার প্রধান আসামি করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। প্রধান আসামি বঙ্গবন্ধুসহ অন্যদের মুক্তি ও পাকিস্তানি সামরিক শাসন উৎখাতের দাবিতে ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি সান্ধ্যআইন ভঙ্গ করে সাধারণ মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে।

সেই মিছিলে পুলিশের গুলিতে মারা যান কিশোর মতিউর রহমান মল্লিকসহ চারজন। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। কেননা স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি দেবেন।

‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’

বঙ্গবন্ধুকে ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে জেলগেটে আনার পর আবারও গ্রেফতার করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করা হয়। এ মামলার প্রকৃত নাম ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’। উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতির কণ্ঠ রোধ করা। কিন্তু পরের বছরের জানুয়ারিতে চিত্র আমূল পাল্টে যায়।

৪ জানুয়ারি কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এরপর ১০ জন ছাত্র নেতার সমন্বয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলন সংগঠিত করা হয়। ঊনসত্তরের ১৭ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঘোষণা দেয়া হয়। হামলা চালানো হয়েছিল ওই কর্মসূচিতে। প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি মিছিল বের করা হলে গুলিতে মারা যান ছাত্রনেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তিনি।

আসাদের মৃত্যু ও শপথ

আসাদের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে বেগবান হয় আন্দোলন। তার মৃত্যুর প্রতিবাদে পরদিন আবারও কলাভবনে কর্মসূচি দেয়া হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা এসে যোগ দেয়। দেশের শ্রমিকরাও তাতে যোগ দেয়।  

ছাত্রনেতারা শহিদ আসাদের গায়ের রক্ত মাখা জামা দিয়ে পতাকা তৈরি করে, শহীদ মিনারে তার লাশ স্পর্শ করে শপথ নেয় আন্দোলনের, শপথ নেয় প্রতিবাদের, গর্জে ওঠে এক ঝাঁক কিশোর-তরুণ প্রাণ, জীবনের মায়া যাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে নাই। ‘আসাদ তোমার রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয় আকাশ-বাতাস। আসাদের মৃত্যুর প্রতিবাদে পরদিন আবারো কলাভবনে কর্মসূচি দেয়া হয়। কর্মসূচিতে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা এসে যোগ দেয়। বাদ পড়েননি শ্রমিকরাও। এতে বেগবান হয়ে ওঠে আন্দোলন। স্লোগান ওঠে: ‘আসাদের গায়ের জামা দিয়ে পতাকা তৈরি করলাম। তার লাশ শহীদ মিনারে রেখে শপথ নিলাম, আসাদ তোমার রক্ত বৃথা যেতে দেবো না।’

এদিকে পল্টনে দাঁড়িয়ে ২১ তারিখ হরতালের ঘোষণা দেয়া হয়। ২১ জানুয়ারি পল্টনে ২২ থেকে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত পরবর্তী তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সেখানে মওলানা ভাসানী ও আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

কর্মসূচির প্রথম দিন ২২ তারিখ এমন কোন বাড়ি নেই যেখানে কালো পতাকা ওঠেনি। ২৩ তারিখ সন্ধ্যার পর হয় মশাল মিছিল।  এরপর ২৪শে জানুয়ারি হরতাল পালিত হয়। পল্টনে জড়ো হয় লাখ লাখ লোক।

পল্টনে চারজনকে গুলি করে হত্যা

মানুষের স্রোত সেদিন ছিল পল্টনের দিকে। মতিউর, মকবুল, রুস্তম ও আলমগীরসহ চারজনকে গুলি করে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ রাজপথে নেমে আসে। আগরতলা মামলার সাক্ষী, তৎকালীন মন্ত্রী, এমনকি বিচারপতির বাড়িতেও মানুষ আগুন লাগিয়ে দেয়। এ যেন এক অন্যরকম প্রতিজ্ঞা, দৃঢ় প্রত্যয়, ইস্পাতকঠিন মনোবল নিয়ে বীরদর্পে সামনে এগিয়ে যাওয়া। ছাত্রনেতারা ভাবতে শুরু করে যে এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তখন প্রথম পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপ এবং ডাকসুর ভিপি বর্তমান বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ এবং জিএস নাজিম কামরান চৌধুরী ১১ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করে এবং পরে জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের একটি অংশ এসে যোগ দেয়।

মাহ্বুব উল্লাহ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ২৪ জানুয়ারির স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘১৯৬৮ সালে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ৫ ডিসেম্বরের পরদিন হরতালের ডাক দেন এবং তা পালিত হয়। সেখানে দু’জন নিহত হন। পরদিন সাত তারিখেও হরতাল পালিত হয়। পরবর্তী ২৯ ডিসেম্বর সারাদেশে হাট-হরতাল পালনের আহ্বান জানান মওলানা ভাসানী। এখান থেকে মানুষ আন্দোলনের উদ্দীপনা পায়।’

তিনি বলেন, ‘পরবর্তীতে ১১ দফা কর্মসূচি আসে ছাত্রসমাজ থেকে, যার মূল বিষয় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। এরপর ১৭ জানুয়ারি থেকে আন্দোলনের সূচনা। ২০ জানুয়ারি আসাদ শহীদ হলেন। এরপর ২৪ জানুয়ারি আরেকটি হরতালের ডাক দেয়া হয়। সে ছিল এক বিশাল গণঅভ্যুত্থান। যখন আমরা পল্টন ময়দানে জড়ো হলাম আমাদের সামনে পাঁচ লাখ লোকের বিশাল সমাবেশ। জনগণের মধ্যে প্রচণ্ড আক্রোশ এবং ক্রোধ কাজ করছিল। তারা তৎকালীন গভর্নর হাউজে (বর্তমান বঙ্গভবন) হামলা করতে চেয়েছিলো। কিন্তু এটা হবে হঠকারী এবং বহু মানুষ প্রাণ হারাবে; সেই চিন্তা করে আমরা সেখানে শহীদ মতিউরের জানাজা আদায় করে মিছিল নিয়ে তৎকালীন ইকবাল হলের দিকে চলে গেলাম। তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্র সমাজ, মেহনতি জনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের একতার বাতাবরণ সৃষ্টি হয় এই আন্দোলনকে ঘিরে।’

তোফায়েল আহমেদের স্মৃতিচারণ

সে সময়কার বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ ২৪ জানুয়ারি দিনটির স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘‘২৪ জানুয়ারি নিহত হওয়া নবকুমার ইন্সটিটিউটের ছাত্র কিশোর মতিউর রহমান এর আগে পল্টনে গায়েবানা জানাজাতে অংশ নিয়েছিল। সেই মতিউরকে তার বাবা আন্দোলন থেকে আটকে রাখতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। মৃত কিশোর মতিউরের পকেটে হাত দিয়ে পরে একটি চিরকুট পাওয়া গেল, যেখানে লেখা ছিল: ‘মা আমি মিছিলে যাচ্ছি, যদি ফিরে না আসি তাহলে মনে করো, তোমার মতিউর বাংলার মানুষের জন্য, শেখ মুজিবের জন্য জীবন দিয়ে গেল, ইতি মতিউর রহমান।’’

তিনি বলেন, ‘আজকের বঙ্গভবন তখন পরিচিত ছিল গভর্নর হাউজ হিসেবে। সেখানেও আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছিল উত্তেজিত জনতা। এরপর মিছিল নিয়ে শৃঙ্খলার সাথে ইকবাল হল (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) মাঠে জড়ো হই। সেদিনই সান্ধ্যআইন (কারফিউ) জারি করে দেয়া হয়। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই আইয়ুব খান ঘোষণা করেন তিনি আর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করবেন না।’

‘‘এর মাঝে ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে ডক্টর শামসুজ্জোহাকে হত্যা করা হয় এবং কারফিউ জারি করা হয়। ২০ তারিখে কারফিউ ভঙ্গ করে মশাল মিছিল করা হয় এবং ২১ তারিখ ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয় শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়ে। এই আন্দোলনের জেরে আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে এবং ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ মামলার অভিযুক্তদের মুক্তি দেয়া হয়। এখন যেটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত, সেখানে ২৩ ফেব্রুয়ারি তাকে সম্বর্ধনা দেয়া হয় এবং ভূষিত করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে’’, যোগ করেন তোফায়েল।

সেখানেই সেদিন শেখ মুজিব জানান, তিনি পাকিস্তান সরকারের কাছে ১১ দফা দাবি তুলে ধরবেন। তোফায়েল আহমেদের ভাষায়: ‘বঙ্গবন্ধু তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, তিনি যদি ছয় দফা না দিতেন আগরতলা মামলা হতো না, এই মামলা না দিলে গণঅভ্যুত্থান হতো না, এই গণঅভ্যুত্থান না হলে তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে পারতাম না, আর তিনি মুক্তি না পেলে ৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী হতাম না। আর তিনি যদি নির্বাচনে বিজয়ী না হতেন, তাহলে আমরা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা লাভ করতে পারতাম না।’

 

সংবাদপত্রের ভূমিকা:

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহ্বুব উল্লাহ বলেন, ‘তখন ইত্তেফাক নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আজাদ, মর্নিং নিউজ, পাকিস্তান অবজারভার, সংবাদ এসব পত্রিকায় প্রতিদিন এই আন্দোলনের খবর বেরুতো গুরুত্ব সহকারে।’ তিনি মনে করেন, ‘এই আন্দোলন শুধু ছাত্র বা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নয়, বরং কৃষকদের মধ্যে, শ্রমিকদের মধ্যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল- ফলে তা হয়ে উঠেছিল গণঅভ্যুত্থান।’

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ফলেই ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ঐতিহাসিকরা এই মামলা এবং মামলা থেকে সৃষ্ট গণআন্দোলনকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেছনে প্রেরণাদানকারী অন্যতম প্রধান ঘটনা বলে গণ্য করে থাকেন।

]]>

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button